Menu

নৃত্যের ছন্দে শুরু দ্বিতীয় দিন সরোদের ঝঙ্কার শেষ

বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের দ্বিতীয় দিন ভারতীয় শিল্পীদের কথক নৃত্য পরিবেশন -সংবাদ

প্রকৃতিতে পৌষের অনুপম পরিবেশ। চারিদিকে হালকা শীতের আবহ। পৌষ আর শীত মানেই যেন আবহমান বাংলার ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির মৌ মৌ ঘ্রাণ আর আনন্দ-হিল্লোল, গ্রাম-গঞ্জে উৎসবীয় আমেজ। এমনই উৎসবীয় আমেজের এই পৌষের দিনভর সূর্য আর কুয়াশার এমনই লুকোচুরি সাঙ্গ হলেই প্রকৃতি জুড়ে নেমে আসে সন্ধ্যা-রাত। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ ঘুমের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় এমন সন্ধ্যা মানেই এখন নতুন আনন্দ-নতুন ছন্দে-হিন্দোলে ভাসার অপেক্ষার প্রহর গুনে। কখন সন্ধ্যা হবে, কখন সময় হবে ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব’ শুরুর? বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের উৎসবেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যানজটের তীব্রতা পেরিয়ে কাজের ক্লান্তি ভুলে গতকালও শতসহ¯্র সংগীতপ্রিয় মানুষ ছুটে এসেছে রাজধানীর ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে। লাইন ধরে শৃঙ্খলার সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে প্রবেশ করেছে এবারে ৬ষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব-২০১৭’-এ।

উৎসবীয় সাজে সজ্জিত আবাহনী মাঠের চারিধার পরিছন্ন। হালকা শীতের আবহের সন্ধ্যার আবছায়া আলো-আঁধারিতে মাঠের চারিপাশে জ্বলে উঠেছে নানা রঙের আলো। নানা রঙের এই আলোকউজ্জ্বল পরিবেশ পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই সাজ-সজ্জার আরেক অনুপম দৃশ্য। মাঠের হাজার হাজার মানুষ এদিক ওদিকে ঘোরাঘুরি করছে। ঠিক সন্ধ্যা সাতটা। বিশাল মাঠের এক পাশে আলোহীন সুসজ্জিত মঞ্চে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠতেই তবলার বোলের সঙ্গে শুরু হলো ভারতীয় একঝাঁক শিল্পীর ‘কত্থুক নৃত্য’ পরিবেশন। আর, এরই মাধ্যমে শুরু হলো বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ৬ষ্ঠবারের মতো পাঁচ দিনব্যাপী বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের দ্বিতীয় দিনের আয়োজন। এতে প্রখ্যাত অদিতি মঙ্গলদাস ড্যান্স কোম্পানি-দৃষ্টিকোন ড্যান্স ফাউন্ডেশনের নৃত্যশিল্পীদের মনোহরণকরা কত্থুক নৃত্য। এ নৃত্যের ছন্দে মুহূর্তেই প্রচন্ড যানজট ঠেলে আসা কয়েক হাজার সংগীতপ্রিয় মানুষ মুহূর্তেই ভুলে যায় তার ভোগান্তির কথা। মেতে ওঠে তাল লয়ের সঙ্গে নৃত্যের ছন্দে। ভারতের এ নৃত্য দলদুটির পুরো পরিবেশনাতে ছিল তিনটি পর্ব। এগুলো হলো- উৎসব, প্রিয়তমের খোঁজে এবং তারানা। নৃত্যাংশে ছিলেন অদিতি মঙ্গলদাস, গৌরী দিবাকর, মিনহাজ, আ¤্রপালি ভান্ডারী, অঞ্জনা কুমারী, মনোজ কুমার, সানি শিশোদিয়া। এছাড়া, কণ্ঠ ও হারমোনিয়াম পরিবেশনে ছিলেন ফারাজ খান, তবলা ও পাঢ়ান্তে মোহিত গাঙ্গানি, পাখোয়াজ ও পাঢ়ান্তে আশীস গাঙ্গানি, বাঁশিতে রোহিত প্রসন্ন। পুরো পরিবেশনাটির মূলধারণা, কোরিওগ্রাফি ও পোশাক পরিকল্পনায় ছিলেন অদিতি মঙ্গল দাস। উৎসব পর্বের মূল পারকাশন রচনা করেছেন গোবিন্দ চক্রবর্তী এবং শ্লোক লিখেছেন সামিউল্লাহ খান। প্রিয়তমের খোঁজে পর্বে ওস্তাদ আমির খসরুর সংগীত ভাষ্যে সংগীত রচনা করেছেন সামিউল্লাহ খান। তারানা পর্বের সংগীত রচনা করেছেন শুভা মুদগাল ও আনীশ প্রধান।

তাদের নৃত্যের ছন্দ-ঝঙ্কার শেষ হতেই মঞ্চে আসে বাংলাদেশের বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের তবলা বাদন। এরপর অনুষ্ঠানের মঞ্চে সন্তর বাজিয়ে শোনান প-িত শিবকুমার শর্মা। খেয়াল পরিবেশন করেন- প-িত উলহাস কশলকার, সেতারে সুর-ঝঙ্কারের মাতিয়ে তোলেন ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খান, ধ্রুপদ সংগীত পরিবেশন করেন-অভিজিৎ কু- ও বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীরা। এরপরেই এদিনের মঞ্চে কাক্সিক্ষত বাঁশির মোহনীয় সুরের ভেলায় ভাসাতে আসেন প-িত রনু মজুমদার। আর সবশেষে সরোদ পরিবেশন করেন প-িত দেবজ্যোতি বোস।

রাতভর এসব উচ্চাঙ্গসংগীত ধারার সুরের ঝর্ণাধারায় হাজার হাজার সংগীতপ্রিয় উপস্থিতি হারিয়ে যায় অন্যরকম এক অনন্তলোকের সন্ধানে। যেখানে প্রেম আর পূর্ণতা অনুপম দ্যোতনা হয়ে এক সঙ্গে ধরা দেয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের এমন অমিয় হিরন্ময় সুরধারা উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব চরাচরেও তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এই পাললিক জনপদ ধ্রুপদ সুরের প্রধানতম উর্বর ভূমি। এই মাটিতে বেড়ে উঠা সুর সাধকরা তাদের নৃত্য আর গায়কীর অনন্যতায় রাগ-রাগিনীতে সে সুধাই বিলিয়ে দিয়েছেন কখনও কণ্ঠে আবার কখনও যন্ত্রে সুর-লহরা সৃষ্টি করে। বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের এ দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে পরদিন ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত একটানা চলে উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের দিকপাল শিল্পীদের সঙ্গে বাংলাদেশি শিল্পীদের কণ্ঠে সুর-লহরী আর হৃদয়ে স্নিগ্ধতা ছড়ানো সরোদ-বেহালা-বাঁশি-সন্তরের মধুময় সুর-ধ্বনি। শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারায় পরিবেশিত এসব সুর-তাল আর লয়ের মাধুরিতে হাজার হাজার শ্রোতা-দর্শক মোহাবিষ্ট হয়ে ওঠেন। রাতভর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর-লহরীর টানে প্রথমদিনের মতো এদিনও আবাহনী মাঠে মগ্ন ছিলেন হাজার হাজার সংগীতপিয়াসী মানুষ। কেটেছে হাজার শ্রোতার নির্ঘুম রাত আর শিশিরের সঙ্গে কেটেছে শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর-ছন্দের অনবদ্য লুকোচুরি। শাস্ত্রীয় সংগীতের নির্যাস উপভোগ করে তবেই ফিরেছেন বাড়ি।

দেশে উচ্চাঙ্গসংগীতের চর্চা এবং প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্য দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সংস্কৃতিচিন্তক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে উৎসর্গ করা এই মহাসংগীতযজ্ঞটির আজ তৃতীয় দিন। এদিনের উৎসবের তৃতীয় দিন। এদিনের উৎসব শুরু হবে বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদেও সেতার-বাদনের মধ্য দিয়ে। এর পর ঘাটম ও কঞ্জিরা-বাদনে থাকবেন বিদ্বান ভিক্ষু বিনায়ক রাম ও সেলভাগণেশ বিনায়ক রাম। খেয়াল পরিবেশন করবেন সরকারি সংগীত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এরপর সরোদ-বাদনে আবির হোসেন, বাঁশি-বাদনে গাজী আবদুল হাকিম, ধ্রুপদ পরিবেশন করবেন প-িত উদয় ভাওয়ালকর এবং বেহালা-বাদনে অংশ নেবেন বিদুষী কালা রামনাথ। আর, এদিনের আয়োজনের সবশেষে খেয়াল পরিবেশন করবেন প-িত অজয় চক্রবর্তী। তার এ পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে শেষ হবে তৃতীয় দিনের উৎসব।

স্কয়ার নিবেদিত এবারের আসরে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ ও ভারত ও পশ্চিমাদেশ কাজাখস্থানের ২ শতাধিক শিল্পী। শিল্পী ও দর্শকের অশগ্রহণ এবং ব্যাপ্তির বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উচাঙ্গসংগীতাসরে পরিণত হওয়া বৃহৎ এ আয়োজনটি সাজানো হয়েছে দেশের নবীন শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীদের সঙ্গে শ্রোতার মন উচাটন করা উপমহাদেশের ওস্তাদ, পন্ডিত. গুরু ও বিদুষীদের অনবদ্য পরিবেশনা দিয়ে।

এবারের এ আয়োজন সর্মথন করছে ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, মেডিক্যাল পার্টনার স্কয়ার হাসপাতাল, অনুষ্ঠানে সম্প্রচার সহযোগী চ্যানেল আই, মিডিয়া পার্টনার আইস বিজনেস টাইমস, আতিথেয়তা সহযোগী প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও। আয়োজন সহযোগী ইনডেক্স গ্রুপ, বেঙ্গল ডিজিটাল, বেঙ্গল বই ও বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়। ইভেন্ট ব্যবস্থাপনায় ব্লুজ কমিউনিকেশনস। উৎসবের সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে পারফেক্ট হারমনি, সিঙ্গাপুর।

 

View Full Article