Menu

বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসব বহুমাত্রিক রঙে উজ্জ্বল

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত নিজেই এক বহুমাত্রিকতার সুরসমুদ্র। বাংলাদেশে এ সঙ্গীতের ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন হলেও নতুন আঙ্গিকে তা জানার সুযোগ করে দিয়েছে বেঙ্গল উচ্চঙ্গসঙ্গীত উৎসব। তাকে ঘিরে বহুমাত্রিকতার রং ছড়িয়েছে এখন। দেশে এই সঙ্গীতের নতুন একটি প্রজন্ম যেমন তৈরি হচ্ছে ঠিক একইভাবে এ উৎসবের নানা আয়োজন বাড়িয়ে দিয়েছে তার মাহাত্ম্য। বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে উৎসব প্রাঙ্গণের ভেতরে-বাইরে ব্যানারগুলোতে বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পীদের নানা ছবির মধ্য দিয়ে স্বনামধন্য সব শিল্পীকে জানছেন আগতরা। প্রদর্শিত হচ্ছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন যন্ত্র। শিশুসহ নানা বয়সীরা সেগুলো দেখছেন এবং এ সঙ্গীতের অনুষঙ্গের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। সুরের জাদুতে ভাসতে ভাসতেই অনেকেই ঘুরে আসতে পারছেন ঢাকা নিয়ে বিশেষ স্থাপত্য প্রদর্শনী ‘আগামীর ঢাকা’ থেকে। যেখানে বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীরে আধুনিক এক ঢাকার চেহারা ফুটে উঠেছে। পুরনো এবং নতুন ঢাকা পুরোটাই প্রদর্শন করা হয়েছে একেবারেই নতুন আঙ্গিকে। খিদে পেলে ফুড কোর্টে গিয়ে খেতে খেতেও উপভোগ করা যাচ্ছে সঙ্গীতের মাধুর্য। আছে প্রিয় শিল্পীর সঙ্গীত সংকলন সংগ্রহের সুযোগ। সবচেয়ে বড় কথা নানা ধরনের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত সরাসরি উপভোগ করে তার রস আস্বাদন করা যাচ্ছে। এমনই আয়োজনে ভরা উৎসবটির তৃতীয় রজনী ছিল শনিবার।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গীত এ উৎসবের তৃতীয় রজনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল ওস্তাদ রশিদ খানের খেয়াল পরিবেশনা। ড. প্রভা আত্রের জাদুমাখা কণ্ঠশৈলীও ছিল মনোমুগ্ধকর। বাঁশির সুরে মনেপ্রাণে দোলা দিয়েছেন শশাঙ্ক সুব্রহ্ম্যণন। তবলা বোলে মাত করেন পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। সেতারের তারে তারে সুরের মূর্ছনা ঝরিয়েছেন পণ্ডিত সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকার শুনিয়েছেন ধ্রুপদ।
উৎসবে তৃতীয় দিন শনিবারের আয়োজন শুরু হয় বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীদের দলীয় সরোদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। ধীরে ধীরে দেশে ধ্রুপদী সঙ্গীতের একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে তারই প্রমাণ এ শিল্পীরা। প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে কামাল জহির শামীম, খন্দকার শামছুজোহা, মো. ইলিয়াস খান, ইলহাম ফুলঝুরি খান, ইশরা ফুলঝুরি খান, শরীফ মুহাম্মাদ আরিফিন রনি ও আল জোনায়েদ দিদার সরোদে রাগ কাফি পরিবেশন করেন।
দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল শশাঙ্ক সুব্রহ্ম্যণনের সমধুর বাঁশি। শিল্পীর বাঁশিতে প্রথমেই সুর ওঠে রাগ পূরবী কল্যাণীর। কর্ণাটকি সঙ্গীত রীতির বিশিষ্ট এই বংশীবাদক জন ম্যাকলফলিন, পাকো দ্য লুচা, জাকির হোসেনসহ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বহু স্বনামধন্য শিল্পীর সঙ্গে বাঁশি বাজিয়েছেন। ২০০৯ সালে জন ম্যাকলফলিনের সঙ্গে বাঁশি বাজানোর জন্য গ্র্যামির মনোনয়ন লাভ করেন তিনি। পরিবেশনার সময় তার সঙ্গে মৃদঙ্গমে ছিলেন পারুপল্লী ফাল্গুন, তবলায় সত্যজিৎ তালওয়ালকার।
বাঁশির সমধুর পরিবেশনা শেষে খেয়াল নিয়ে মঞ্চে আসেন ড. প্রভা আত্রে। তিনি শুরুতেই পরিবেশন করেন রাগ শ্যামকল্যাণ। এরপর নিজের সৃষ্টি করা রাগ মধুরোকোষে খেয়াল পরিবেশন করে মুগ্ধতা ছড়ান। এরপর রাগ কানাড়ায় দাদরা নায়োকি পরিবেশন করেন। সবশেষে রাগ বৈরবীতে ভজন পরিবেশন করে শেষ করেন তার পরিবেশনা। ড. প্রভা আত্রে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের কিরানা ঘরানার অন্যতম অগ্রজ শিল্পী। তিনি খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, গজল ও নাট্যসঙ্গীতে সমান পারঙ্গম।
কণ্ঠের মাধুর্যে খেয়াল পরিবেশনের পর তবলার পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন ফরুখাবাদ বাদনরীতির অন্যতম ধারক ও বাহক পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। তিনি শুরুতেই তিন তাল পরিবেশন করেন। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমনসে তিনিই প্রথম ভারতীয় শিল্পী, যিনি তবলা পরিবেশন করেন।
এরপর ধ্রুপদ পরিবেশন করেন পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকার। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সনাতন ধারা ধ্রুপদের বিশিষ্ট শিল্পী তিনি। ধ্রুপদ সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করতে তার বিশেষ অবদান রয়েছে।
পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকারের পর সেতার পরিবেশন করেন পণ্ডিত সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বাদনে স্বতঃস্ফূর্ততা তার সঙ্গীতশৈলীকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। ইউনেস্কোর প্লেনারি অধিবেশনে কৃতিত্বের সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন।
তৃতীয় রাতের শেষ চমক ছিল ওস্তাদ রশিদ খানের খেয়াল পরিবেশন। ভারতের অন্যতম খেয়ালিয়া তিনি। রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা এনায়েত হোসেন খঁার প্রপৌত্র এবং ওস্তাদ গোলাম মুস্তফা খাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র এই শিল্পী। তার গায়নে বিশেষত্বের ছাপ রেখেছেন বিলম্বিত আলাপের আবেগময়তায়।
শিল্পীর সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেন পণ্ডিত শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ওস্তাদ রশিদ খানের পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় উৎসবের তৃতীয় রাতের পরিবেশনা। একটু পর ভোর নামে রাজধানীর বুকে। বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব ২০১৬-এর নিবেদক স্কয়ার গ্রুপ। আয়োজন সমর্থন করছে ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড।