Menu

ঢাকার দিনরাত

নবেম্বর এলে বাতাসে খানিকটা মিষ্টি হাহাকারের সঙ্গে শীতের গন্ধও মেলে! হঠাৎ করেই গত সপ্তাহে একটু মিষ্টিমিষ্টি ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করেছে। সুট-কোট নামিয়ে ফেলেছেন বহু শীতকাতুরে মানুষ। আমি সবে টি-শার্ট থেকে ফুল সিøপ শার্টে নেমেছি। যাক, নবেম্বর এলে আরেকটা বিষয় রাজধানীবাসীর লক্ষ্য না করে উপায় থাকে না। সেটি হলো জোড়া উৎসব- একেবারে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব। অবশ্য ‘লিট ফেস্ট’ নামে সাহিত্যের একটা উৎসবও হচ্ছে গত কয়েক বছর, তবে সেটায় ইংরেজি সাহিত্যেরই প্রাধান্য। ফোকফেস্ট নামে বহুল পুরচিত লোকসঙ্গীত উৎসব এবং সেই সঙ্গে বেঙ্গলের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবÑ দুটিই গানের উৎসব। আর গান দিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের কান, থুড়ি মন কাড়া যায়। প্রতি বছর নবেম্বর মাসে আর্মি স্টেডিয়ামে কয়েক দিনব্যাপী উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব হয়ে থাকে। গত কয়েক বছর ধরে এটা সঙ্গীতপ্রেমী নাগরিকদের বার্ষিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। দু’বছর আগে বোমা মেরে আগুনে পোড়ানোর আতঙ্কের ভেতরও সফলভাবে উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ হাজার দর্শক-শ্রোতা প্রতি সন্ধ্যায় উপস্থিত হয়েছেন। গত বছর থেকে একই ধারায় আরও একটি উৎসব পেল রাজধানীবাসীÑ ফোক ফেস্টিভ্যাল। বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানÑ মূলত তিন দেশের লোকসঙ্গীত শিল্পীরা এতে অংশ নেন। গতবার এসেছিলেন আবিদা পারভীন, পবন দাস বাউল, অর্ক মুখার্জির মতো জনপ্রিয় শিল্পীরা। এবারও আসর জমিয়েছেন মমতাজ। এসেছিলেন ভারতের কৈলাস খের। বাংলাদেশের বেশ ক’জন শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। বিস্তারিত সংবাদ বেরিয়েছে সংবাদপত্রে। তাই এ নিয়ে বিশদ বলার কিছু নেই। শুধু বলব, এবার এমন কিছু দৃশ্য দেখলাম তাতে তারুণ্যের প্রাণস্পন্দন কিছুটা হলেও অনুভব করতে সমর্থ হলাম। উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবে এটা দেখিনি। সেটি হলো শত শত মানুষ খোলা আকাশের নিচে ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসে গান উপভোগ করেছেন। আবার দল বেঁধে তারা গানের তালে তালে নেচেছেনও। কোথাও কোন বিরূপতা বিড়ম্বনা নেই। সবাই স্বাভাবিক, সংযত, উৎসবমুখর। এমন একটি পরিবেশ তৈরি হওয়াটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি কথা বলা দরকার। সঙ্গীত উৎসবে গানের সঙ্গে একটু আধটু নাচও থাকতে পারে। কিন্তু এবার দেখলাম স্প্যানিশ নাচটাই যেন গান কিংবা বাজনা ছাপিয়ে প্রধান হয়ে উঠেছে। এটি কি প্রত্যাশিত? তাছাড়া উৎসবে পরিবেশিত শতভাগ গানই কি ফোক? উৎসবটিকে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করতে হলে আয়োজকদের এসব নিয়ে ভাবতে হবে।

ঢাকার নাগরিক মধ্যবিত্ত মন

ঢাকায় গণপরিবহনের ভীষণ সঙ্কট রয়েছে, মেয়েদের বাসে ওঠা এক বিরাট বিড়ম্বনার বিষয়। একটা-দুটো ‘মহিলা বাস’ অবশ্য দেখা যায় কালেভদ্রে। তবে সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি তো হয়েছেই। বিশেষ করে বিআরটিসি-র এসি বাসে চালকের পেছনে ১৩টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। বাদবাকি আসনগুলো কি পুরুষের জন্য? তা তো নয়। তবু অনেকেই ভাবেন সেগুলো পুরুষদের আসন, মেয়েরা সেখানে বসতে পারেন না। ওই আসনগুলোয় সবারই সমানাধিকারÑ এটা বহু নাগরিক মানতে চান না। আবার অনেক যাত্রী গ্যাঁট হয়ে মেয়েদের সিটে বসে থাকেন, না বলা পর্যন্ত তারা মেয়েদের সেই সিট ছেড়ে দেন না, অনেকে আবার তর্ক জুড়ে দেন। প্রসঙ্গ সেটা নয়। বলছিলাম নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের কথা। তবে শুধু নারীযাত্রী নয়, ওইসব আসনে শিশু ও প্রতিবন্ধীদেরও সমানাধিকার রয়েছে। প্রশ্নটা সেখানেই। সেদিন এক মধ্যবয়সী, মানে পঞ্চাশোত্তর এক ভদ্রলোক বাসে উঠলেন, হাতে তার ক্রাচ। বাসের সব কটি নারী-আসন পরিপূর্ণ। নারীরাই বসে আছেন, একজনও প্রতিবন্ধী নেই। অথচ ওই অসুস্থ যাত্রীর জন্য কেউই আসন ছেড়ে দিলেন না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী বয়সের মেয়েরাও তাদের পিতার বয়সী ওই অসুস্থ ব্যক্তিকে উপেক্ষা করে গেলেন। সন্দেহ জাগে ভদ্রলোকের জায়গায় বয়স্ক ভদ্রমহিলা থাকলেও তারা আসন ছেড়ে দিতেন কিনা। পুরুষরাও অবশ্য দেন না। এটাকে কী বলব? মূল্যবোধের অবক্ষয়? মানবিকতার নিম্নগামিতা? নাকি নাগরিক মন এমনই আত্মপর স্বার্থান্ধ হয়ে গেছে যে তার সাধারণ বিবেচনাবোধ লোপ পেয়েছে?

আসছি হাসপাতালের অর্থোপেডিক জোনের গল্পে। হাড়গোড় ভাঙা বা হাড়ের সমস্যায় যারা ভোগেন তারাই সেখানে যান বটে। একটি নামী হাসপাতালের ওই জোনটিতে সেই সন্ধ্যায় ভিড় খুব একটা কম ছিল না। হুইল চেয়ারের রোগীও ছিলেন সেখানে, ছিলেন ক্রাচবন্দি মানুষ। তিনজন অর্থোপেডিক চিকিৎসক রোগী দেখছিলেন। মানুষের সঙ্গে মেশার এবং কখনো কখনো অযাচিতভাবে ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে গালগল্প করার বাঙালি-বৈশিষ্ট্যের কথা সুবিদিত। শহুরে বাঙালি এখন বদলে গেছে। এতগুলো অসুস্থ মানুষ অথচ সবাই শান্ত, নিশ্চুপ। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছেন না, আড়চোখে অবশ্য সবাই সবার রোগ নিরূপনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কথা হলো ব্যক্তিগত অসুস্থতা বা শারীরিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি গোপন রেখেও কিংবা অন্যের ব্যাপারে কৌতূহল প্রকাশ না করেও সাধারণ সৌজন্যমূলক আলাপচারিতা চলতে পারে। সেটাই সঙ্গত। অথচ হাসপাতালে দুঃখশোকের ভেতরে থেকেও মানুষ মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে। কষ্ট ভাগাভাগি করার মতো অনাধুনিক যে তারা নন!

কবিতা গান আড্ডা

ঢাকায় এখন আর আগের মতো কবি-লেখকদের আড্ডার নির্দিষ্ট স্থান নেই। কখনো কোনো বইপাড়ায় কখনোবা কোনো লেখকের বাসায় আড্ডা বসে। আশির দশকের শেষ থেকে মাঝ নব্বুই পর্যন্ত বছরগুলোয় তিন কবিÑ শামসুর রাহমান, সিকদার আমিনুল হক আর রুবী রহমানের বাসায় বেশ কটি আড্ডার স্মৃতি আমার জীবনের মূল্যবান সঞ্চয়। সেসব আড্ডায় কেউ কবিতা পড়তেন বলে স্মরণে নেই। নিখাদ বসতো গালগল্পের আসর, আর পানাহার। হাসি-ঠাট্টা হতো, তার মাঝখানে সাহিত্যের সিরিয়াস প্রসঙ্গও উঠে আসতো। এখনকার আড্ডাগুলোয় যোগ হয়েছে স্বরচিত কবিতাপাঠ এবং সংগীত পরিবেশনা। কবি রুবী রহমানের বাসায় গত রবিবার সন্ধ্যায় পনেরজন কবি মিলিত হয়েছিলেন। প্রত্যেকেই নিজেদের লেখা পড়ে শোনালেন। তিন কবি গাইলেন গান। আর সবশেষে নৈশভোজ। সব মিলিয়ে দারুণ প্রাণসঞ্চারি এক আয়োজন। ঘরোয়া কবিতাপাঠের আয়োজনে মগ্ন হয়ে কবিতা শোনা যায়, মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ থাকে। আসলেই কবিতা হাটের জিনিষ নয়। এ ধরনের সম্মিলনীতে তরুণ-প্রবীণ লেখকদের মধ্যে একটা সাঁকো গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত পরিচয় এবং দেখাসাক্ষাৎ একে অপরকে কাছে আনে। পরস্পরের সদ্য সৃজনকর্ম সম্মন্ধেও ধারণালাভ ঘটে। অল্পবয়সী ছেলে (ছেলে বলা ঠিক হচ্ছে না তিনি রীতিমতো তরুণদের শিক্ষক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের) অভি চৌধুরীর প্রেমের কবিতাগুলো সাধারণ মনকে আলোড়িত করার মতো। অভি গানও শোনালেন। তৈরি করা কণ্ঠ। জানা গেল ছায়ানটে গান শিখেছেন। সাবেরা তাবাসসুমের গান শুনেও মনে হলো নিশ্চয়ই সংগীতে তালিম নিয়েছেন। দুই সিনিয়র কবি আসাদ চৌধুরী ও রবিউল হুসাইন বাহবা দিলেন তাদের।

তারিক সুজাতের কবিতায় হলি আর্টিজানের ঘটনা, মিনার মনসুরের কবিতায় হিলারি-ট্রাম্প, শাহনাজ নাসরীনের কবিতায় রানা প্লাজা ট্রাজেডি মর্মস্পর্শীভাবে উঠে আসে। কবিতা পড়লেন ফারুক মাহমুদ, মুহাম্মদ সামাদ, কামরুল হাসান, সাকিরা পারভীন, ওবায়েদ আকাশ, পিয়াস মজিদ, শামস আরেফিন প্রমুখ। একটা বিষয় বেশ লক্ষণীয়Ñ প্রত্যেক কবিই আজকাল ভালো আবৃত্তি করছেন। সেখানে আঞ্চলিকতার টান কিংবা ভুল উচ্চারণ, অনাকর্ষণীয় বাচন একেবারে অনুপস্থিত। কলকাতার সাংবাদিক বাহাউদ্দিনও কবিতা পড়েন। সবশেষে হোস্ট কবি রুবী রহমানের কবিতা শোনার সৌভাগ্য হলো। তাঁর কবিতা পাঠের সময় বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল দেয়ালের দুটি ছবির দিকে, আর চোখ ভিজে উঠছিল। অনেকেই জানেন বেশ ক’বছর আগে বাসায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান কবির স্বামী কমরেড নূরুল ইসলাম ও ছেলে তমোহর।

কুকুর-বেড়ালের গল্প

সারমেয় শব্দের অর্থ অনেক পাঠক নাও জানতে পারেন, কিন্তু কোনো লেখকের এ ব্যাপারে অজ্ঞতা অনাকাক্সিক্ষত। চতুষ্পদ প্রাণী কুকুরকে কুকুর না ডেকে, সারমেয় বলা হয়েছে অনেক গল্প ও কবিতায়। অবশ্য বহু সাধারণ মানুষ রেগে গিয়ে তারই সমগোত্রীয় কাউকে ‘কুকুর’ বলে সম্বোধন করে থাকেন। শোনা কথা, তবু বলি। এক সিনিয়র ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে তার এক শিষ্যকে কুকুর বলায় সেই শিষ্যটি নির্লজ্জ ও চটপটে উত্তর দিয়ে বলেছিলেনÑ স্যার, জানেন তো কুকুররা কিন্তু খুব প্রভুভক্ত হয়। এ উত্তর শুনে সেই প্রভুটি হেসেছিলেন নাকি কেঁদেছিলেন সেই খবরটি আর জানতে পারিনি। আসলে এই ঢাকা শহরে সত্যিকার কুকুর নিয়ে দু’কথা বলার জন্য এই গৌরচন্দ্রিকা।

কুকুরের কথা বলতে গেলে বিড়ালের প্রসঙ্গও এসে পড়ে বৈকি। ইঁদুর-বেড়ালের মজাদার কা-কারখানা নিয়ে হলিউডের জনপ্রিয় কার্টুন টম অ্যান্ড জেরি গোটা বিশ্বেই আলোচিত। শুধু শিশু কেন, বুড়োরাও নির্মল আনন্দ পান কার্টুনটি দেখে। টম হলো নীলাভ-ছাই, ছাই-নীলাভ অথবা ছাই রঙের পোষা বিড়াল (ওর পশমের রঙ বিড়ালের রাশিয়ান ব্লু প্রজাতির মতো), আর জেরি হলো বাদামী রঙের ছোট এক ইঁদুর যার বাড়ি টমের খুব কাছেই। টম খুব অল্পতেই রেগে যাওয়া স্বভাবের হলেও জেরি খুব স্বাধীন আর সুযোগসন্ধানী। টমের সঙ্গে জেরির মানসিকতার কোনই মিল নেই। প্রতিটি কার্টুনে সাধারণত জেরিকে বিজয়ীর বেশে দেখা যায় আর টমকে বিফল। তাছাড়াও টমের জয়ের মতো বিরল পরিণতিও দেখা যায় খুব অল্প সময়ে। কখনও কখনও বিশেষ করে ক্রিসমাসের সময় টমকে জেরির জীবন বাঁচাতে বা অন্তত উপহার আদান-প্রদান করতে দেখা যায়। মাঝে মাঝে দু’জনের দৈনন্দিন ছোটাছুটিকে ওদের রুটিনমাফিক খেলা হিসেবে দেখানো হয়। টম কোন মেয়ে বিড়ালের প্রেমে পড়লে জেরি ঈর্ষান্বিত হয়ে ভাঙ্গন ধরানোর চেষ্টা করে এবং টমকে শেষ পর্যন্ত জেরির সঙ্গে হাত মিলাতেও দেখা যায়। তারপর অবশ্য ওরা ওদের পুরনো খেলাতেই ফিরে যায়।

ওই কার্টুনের দেখাদেখি ঢাকার বহু বাড়ির বেড়ালের নাম হয়েছে জেরি। আমাদের বাড়ির বেড়ালের নাম অবশ্য গুল্লু, রান্না করা খাবার ছাড়া তার রোচে না। আমি এক জেরিকে চিনি যেটি এঁটোকাঁটা-দুধভাত ছোঁয় না। তার জন্য কিনে আনতে হয় ক্যাটফিড। ঢাকার অভিজাত এলাকার পোষা বেড়ালগুলোর জন্য মাসিক যে বরাদ্দ তা দিয়ে কি ফুটপাথে আশ্রয়গ্রহণকারী একটি দুস্থ পরিবারের সারা মাসের খোরাকি মেটানো যাবে না? নিশ্চয়ই যাবে।

View Full Article