Menu

বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব ২০১৬

thumbnail পঞ্চম দিনে থাকছে পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার পরিবেশনা

আজ থেকে শুরু হচ্ছে ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব ২০১৬’। আয়োজনের এটি পঞ্চম আসর। আর্মি স্টেডিয়ামে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে উৎসব, চলবে ভোর ৫টা পর্যন্ত। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে উৎসর্গ করা এবারের আসরে নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ১৬৫ জন শিল্পী অংশ নেবেন। আর বাইরে থেকে আসছে প্রায় ৮০ জন শিল্পী। ইতিমধ্যে ৫০ হাজারের বেশি দর্শক অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে উৎসবের টিকিট সংগ্রহ করেছে। ব্যাগ, খাবার, কোনো ধরনের পানীয় বা ধূমপানের সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে ঢোকা যাবে না। বয়স্ক বা যাঁদের হাঁটাচলায় অসুবিধা আছে, তাঁদের জন্য থাকবে হুইলচেয়ার। কোনো ধরনের পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে না। তবে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বাসায় ফেরার জন্য নির্দিষ্ট রুটে বাসের ব্যবস্থা থাকবে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এ উৎসব নিবেদন করছে স্কয়ার গ্রুপ। আয়োজনে সমর্থন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড

পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া

বাবা ছিলেন কুস্তিগির। ছেলেকে তাই কুস্তি শিখতে আখড়ায় ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু ছেলের মন পড়ে থাকত সংগীতে। বাবাকে না জানিয়ে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে সংগীতচর্চা করতেন চৌরাশিয়া। ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিবেশী পণ্ডিত রাজারামের কাছ থেকে কণ্ঠসংগীতের তালিম নেন। পরে পণ্ডিত ভোলানাথের বাঁশি শুনে সিদ্ধান্ত নেন বাঁশি শিখবেন। তাঁর কাছে দীর্ঘ আট বছর বাঁশি বাজানো শেখেন। ১৯৫৭ সালে উড়িষ্যার অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একই সঙ্গে কম্পোজার ও পারফর্মার হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিটলস ব্যান্ডের অ্যালবামেও বাজিয়েছেন। তাঁর গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের মধ্যে আছেন ইয়েহুদি মেনুহিনের মতো শিল্পী। শিবকুমার শর্মার সঙ্গে যৌথভাবে ভারতীয় সিনেমার সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ‘শিব-হরি’ নামে। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণ, সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার ও ন্যাশনাল এমিনেন্স অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করেছে। ডাচ রাজপরিবারের পক্ষ থেকে ‘অফিসার ইন দ্য অর্ডার অব অরেঞ্জ নাসাউ’ খেতাব এবং ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে লাভ করেছেন নাইট উপাধি। বর্তমানে তিনি রটারডাম মিউজিক কনজারভেটরির ওয়ার্ল্ড সংগীত বিভাগের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর।

ওস্তাদ রশিদ খান

thumbnail

পণ্ডিত ভিমসেন যোশি একবার বলেছিলেন, রশিদ ভারতীয় কণ্ঠসংগীতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের নিশ্চয়তা দেয়। ১৯৬৬ সালে উত্তর প্রদেশের বাদায়ুনে রশিদের জন্ম। ছোটবেলায় গানে বেশি মনোযোগ ছিল না। চাচা গুলাম মোস্তফা খান তাঁর প্রতিভা টের পেয়ে তাঁকে গান শিখতে পাঠিয়ে দেন মুম্বাই। পরে নানা নিসার হুসেইন খান তাঁকে তালিম দিতে শুরু করেন। ভোর ৪টায় শুরু হতো তাঁদের সুরসাধনা। একটা সুর সারা দিন ধরে তুলেছেন এমন দিন অনেক গেছে রশিদের। প্রথম জনসমক্ষে গাইতে আসেন ১১ বছর বয়সে। দিল্লির আইটিসি আসরে তিনি গান করেন ১২ বছর বয়সে। ১৯৮০ সালের এপ্রিলে রশিদ নানার সঙ্গে কলকাতা আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমিতে চলে আসেন। ১৯৯৪ সালে একাডেমি তাঁকে কলাকার মর্যাদা দেয়। ওস্তাদ রশিদ খান পদ্মশ্রী ও সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। রামপুরি-সহস্বন ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদ ইনায়েত হোসেন খান তাঁর প্রপিতামহ। ওস্তাদ আমির খান আর ভিমসেন যোশি তাঁর প্রেরণা।

উৎসবে অতিথি

প্রথম দিন

২৪ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার

♦ দলীয় নৃত্য ‘রবি করোজ্জ্বল’ : শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল নৃত্যনন্দন।

♦ উদ্বোধন

♦ যুগলবন্দি : প্রবীণ গোড়খিনদি (বাঁশি) ও রাতিশ তাগড়ে (বেহালা)। তবলায় রামদাস পালসুল।

♦ খেয়াল : বিদুষী গিরিজা দেবী। তবলায় গোপাল মিশ্র।

♦ সরোদ : ওস্তাদ আশিষ খান। তবলায় পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ।

♦ খেয়াল যুগলবন্দি ‘জাসরঙ্গি’ : বিদুষী অশ্বিনী ভিদে দেশপান্ডে ও পণ্ডিত সঞ্জীব অভয়ংকর। তবলায় আজিঙ্কা যোশি ও রোহিত মজুমদার।

♦ বেহালা : ড. এল সুব্রামানিয়াম। তবলায় পণ্ডিত তন্ময় ঘোষ।

দ্বিতীয় দিন

২৫ নভেম্বর, শুক্রবার

♦ ওড়িশি নৃত্য : বিদুষী মাধবী মুদগাল ও আরুশি মুদগাল।

♦ তবলা দলীয় : বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীরা।

♦ খেয়াল : প্রিয়াঙ্কা গোপ। তবলায় ইফতেখার আলম প্রধান।

♦ সন্তুর : রাহুল শর্মা। তবলায় সত্যজিৎ তালওয়ালকার।

♦ দলীয় কণ্ঠসংগীত : মোহাম্মদ শোয়েব ও অন্যান্য। তবলায় ইফতেখার আলম প্রধান, পাখোয়াজে সুষেন কুমার রায়।

♦ সেতার : পূর্বায়ণ চট্টোপাধ্যায়। তবলায় অনুব্রত চট্টোপাধ্যায়।

♦ খেয়াল : পণ্ডিত উল্লাস কশলকর। তবলায় পণ্ডিত সুরেশ তালওয়ালকার।
♦ যুগলবন্দি : পণ্ডিত রনু মজুমদার (বাঁশি) ও ইউ রাজেশ (ম্যান্ডোলিন)। তবলায় পণ্ডিত অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

তৃতীয় দিন

২৬ নভেম্বর, শনিবার

♦ সরোদ দলীয় : বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীরা।

♦ বাঁশি : শশাঙ্ক সুব্রামানিয়াম।

♦ খেয়াল : ড. প্রভা আত্রে। তবলায় রোহিত মজুমদার।

♦ তবলা : পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ তালওয়ালকার।

♦ ধ্রুপদ : পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকার। পাখোয়াজে প্রতাপ আওয়াদ।

♦ সেতার : পণ্ডিত সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তবলায় পরিমল চক্রবর্তী।

♦ খেয়াল : ওস্তাদ রশিদ খান। তবলায় পণ্ডিত শুভংকর বন্দ্যোপাধ্যায়।

চতুর্থ দিন

২৭ নভেম্বর, রবিবার

♦ দলীয় কত্থক নৃত্য : মুনমুন আহমেদ ও তাঁর দল ‘রেওয়াজ’।

♦ তবলা : নীলেশ রণদেব।

♦ খেয়াল : জয়তীর্থ মেবুন্দি। তবলায় আজিঙ্কা যোশি।

♦ তবলা যুগলবন্দি : পণ্ডিত যোগেশ শামসি ও পণ্ডিত শুভংকর বন্দ্যোপাধ্যায়।

♦ কর্ণাটকি কণ্ঠসংগীত যুগলবন্দি : রঞ্জনী ও গায়ত্রী।

♦ সরোদ : পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার। তবলায় পণ্ডিত যোগেশ শামসি।

♦ খেয়াল : পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। তবলায় সৌমেন সরকার।

পঞ্চম দিন

২৮ নভেম্বর, সোমবার

♦ দলীয় কণ্ঠসংগীত : সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবলায় স্বরূপ হোসেন ও জাকির হোসেন।

♦ সেতার দলীয় : বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীরা।

♦ সমাপনী

♦ সন্তুর : পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। তবলায় পণ্ডিত যোগেশ শামসি।

♦ খেয়াল : কুমার মারদুর। তবলায় আজিঙ্কা যোশি।

♦ সেতার : পণ্ডিত কুশল দাস, পণ্ডিত শুভংকর বন্দ্যোপাধ্যায়।

♦ খেয়াল : আরতি আঙ্কালিকার। তবলায় রোহিত মজুমদার।

♦ বাঁশি : পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া।

মাধবী মুদগাল

thumbnail

ওড়িশি নৃত্যধারার খ্যাতিমান প্রবক্তা মাধবী মুদগাল। তাঁর বাবা অধ্যাপক বিনয়চন্দ্র মুদগাল নৃত্য ও সংগীতশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মাধবী প্রথমে গুরু হরেকৃষ্ণ বেহেরা ও পরে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে শিক্ষা নেন। নৃত্য পরিচালনা ও কোরিওগ্রাফিতে গভীর বোধসঞ্চার এবং নবীনদের শিক্ষাদানে অফুরান আগ্রহ মাধবী মুদগালকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নৃত্যকলা পরিবেশন করে সুনাম অর্জন করেছেন তিনি। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, প্যারিসের ‘গ্রাঁদে মেদাইলে ডি লা ভি ডি পারি’ সম্মাননা। এ ছাড়া সংস্কৃতি পদক, কেন্দ্রীয় সংগীত নাটক একাডেমি পদক, দিল্লি সরকারের পরিষদ সম্মান, নৃত্যচূড়ামণি এবং ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে ‘গ্রাঁদে মেদাইলে ডি লা ভিল’ সম্মাননা অর্জন করেন।

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী

thumbnail

বাপ-দাদার বাড়ি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ। দেশভাগের সময় বাবা অজিত কুমার চক্রবর্তী চলে যান পশ্চিম বাংলায়। সেখানেই ১৯৫২ সালের ৭ জানুয়ারি জন্ম পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর। বাপ-দাদার দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল প্রথম থেকেই, এখন তো বেশ কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত বাংলাদেশে আসছেন। এর পেছনে অন্যতম কারণ ‘বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব’।

অজয় চক্রবর্তীর গানে হাতেখড়ি ১৯৬০ সালে। প্র্রথম গুরু বাবা অজিত চক্রবর্তী। তাঁর কাছে উত্তর ভারতীয় সংগীতের দীক্ষা নেন। এরপর একে একে শিষ্যত্ব নেন পদ্মভূষণ পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খানের সন্তান ওস্তাদ মুনাওয়ার আলী খান, কানাই দাস বৈরাগী, পান্নালাল সামন্তের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের কাছে।

১৯৭৭ সালে যোগ দেন ‘আইটিসি সংগীত গবেষণা একাডেমি’তে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। টেলিভিশনে প্রথম খেয়াল পরিবেশন করেন ১৯৮১ সালে।

তাঁকে পাতিয়ালা-কাসুর ঘরানার শিল্পী ধরা হলেও তিনি একই সঙ্গে ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান ও ওস্তাদ বরকত আলী খানের গায়কী ঢঙের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ ছাড়া ভারতের অন্যান্য প্রধান শাস্ত্রীয় ঘরানা বিশেষত—ইন্দোর, দিল্লি, জয়পুর, গোয়ালিয়র, আগ্রা, কিরানা, রামপুর এবং দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকি সংগীতেও তাঁর দখল রয়েছে। রবীন্দ্র, নজরুল, শ্যামাসংগীত গায়ক হিসেবেও নাম কামিয়েছেন। প্লেব্যাকও করেছেন। রয়েছে এক শর বেশি অ্যালবাম। বেশির ভাগই রিলিজ পেয়েছে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জার্মানি থেকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত অজয় চক্রবর্তী অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার পদ্মশ্রী পদক (২০১১), সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার (১৯৯৯-২০০০ ), কুমার গৌরব সম্মান (১৯৯৩) এবং বাংলা চলচ্চিত্র ছন্দনীড়ের (১৯৮৯) জন্য শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার। ২০১২ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সর্বোচ্চ দুই সম্মাননা—‘মহাসংগীত সম্মান’ ও ‘বঙ্গভূষণ’।

বিদুষী গিরিজা দেবী

thumbnail

সেনিয়া ও বেনারস ঘরানার প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী বিদুষী গিরিজা দেবী। ১৯২৯ সালের ৮ মে ভারতের বারানসির এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। গিরিজা দেবীর বাবাও ছিলেন গানের মানুষ। কণ্ঠশিল্পী ও সারেঙ্গিবাদক সরজুপ্রসাদ মিশ্রের কাছে প্রথমে খেয়াল এবং পরে টপ্পায় প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরবর্তীকালে চাঁদ মিশ্রের কাছে বিভিন্ন সংগীতরীতি রপ্ত করেন। ২০ বছর বয়সে ১৯৪৯ সালে এলাহাবাদে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র মাধ্যমে শ্রোতাদের গান শোনানো শুরু করেন তিনি। ছয় দশকের অধিক বর্ণাঢ্য সংগীতজীবনে অর্জন করেছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা, যার মধ্যে অন্যতম পদ্মবিভূষণ (২০১৬), পদ্মভূষণ (১৯৮৯), পদ্মশ্রী (১৯৭২), সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৭) এবং সংগীত নাটক একাডেমি ফেলোশিপ। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কলকাতার আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমিতে গুরু হিসেবে নিয়োজিত তিনি।

রঞ্জনী-গায়ত্রী

রঞ্জনী ও গায়ত্রী বালসুব্রহ্মণ্যন ভগ্নিদ্বয় কর্ণাটকি কণ্ঠশিল্পী ও বেহালাবাদক জুটি। সম্মুখানন্দ সংগীত বিদ্যালয়ের অধ্যাপক টি এস কৃষ্ণস্বামীর কাছে যখন তাঁদের হাতেখড়ি শুরু তখন রঞ্জনীর বয়স ৯ বছর আর গায়ত্রীর ৬। একক ও যুগল পরিবেশনা উভয়েই তাঁদের মুনশিয়ানার ছাপ রয়েছে। ড. বালমুরলি কৃষ্ণ ও টি বিশ্বনাথনসহ অন্যান্য বিশিষ্ট শিল্পীর সঙ্গে তাঁরা মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছেন। ১৯৯৭ সাল থেকে তাঁরা মঞ্চে গাইছেন। লাইভ কনসার্টে পরিবেশনা নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁদের প্রথম অ্যালবাম ‘কুরিনজি মালার’। এরপর কনসার্টে পরিবেশনা নিয়ে আরো কয়েকটি অ্যালবাম করেন তাঁরা। মৌলিক পরিবেশনা নিয়েও অ্যালবাম করেছেন। সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন এই বোন জুটি। এখন পর্যন্ত তাঁদের সংগীত পরিচালনায় ১০টি গান প্রকাশ পেয়েছে। রঞ্জনী ও গায়ত্রী তাঁদের পরিবেশনার জন্য বিভিন্ন পদক এবং খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। ত্যাগ ব্রাহ্মগণসভার বাণী কলা সুধাকর পুরস্কার, ভারতীয় বিদ্যাভবনের আজীবন সম্মাননা, চেন্নাই সাংস্কৃতিক একাডেমি প্রদত্ত সংগীতকলা শিরোমণি পদক, সংস্কৃতি পুরস্কার, কল্কি কৃষ্ণমূর্তি স্মৃতি পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা অর্জন করেছেন তাঁরা।

ড. প্রভা আত্রে

ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের স্বনামধন্য শিল্পী ড. প্রভা আত্রে। বর্তমান বয়স ৮৪ বছর। কিন্তু এখনো কণ্ঠের জাদুতে মোহিত করেন শ্রোতাদের। কিরানা ঘরানার অন্যতম অগ্রজ গায়িকা তিনি। সুরেশবাবু মানে ও তাঁর ভগ্নি পদ্মভূষণ হিরাবাই বারোদেকারের কাছে তিনি প্রাথমিক তালিম গ্রহণ করেন। ওস্তাদ আমির খান ও ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁর গান তাঁকে দারুণ প্রভাবিত করলেও নিজস্ব উদ্ভাবন ও সৃজনে তিনি গড়ে তোলেন স্বতন্ত্র গায়নশৈলী। যা সংগীতজগতে তাঁকে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে। গাওয়ার পাশাপাশি প্রভা আত্রে খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, গজল ও নাট্যসংগীতে সমান পারঙ্গম। সংগীতের পাশাপাশি আইন এবং বিজ্ঞান নিয়ে পড়ুয়া এ শিল্পী সংগীত পরিচালনার কাজও করেন। বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এরমধ্যে অন্যতম ভারত সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, কালিদাস সম্মাননা, সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার, ঠাকুর একাডেমি রত্ন পদক প্রভৃতি।

পণ্ডিত উল্লাস কশলকর

ষাট বছর বয়স হয়ে গেছে। তবু শ্রোতাদের মাতিয়ে যাচ্ছেন আগের মতোই। গোয়ালিয়র, জয়পুর আর আগ্রা ঘরানায় শিক্ষা অর্জন করেছেন উল্লাস কশলকর। জন্ম ভারতের নাগপুরে, ১৯৫৫ সালে। সংগীতে হাতেখড়ি বাবার কাছে। পরে নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। তবে তাঁর প্রধান ওস্তাদ পণ্ডিত রাম মারাঠে ও গজনানরাও যোশি। আগের দিনগুলোতে ওস্তাদরা ছিলেন সভাগায়ক। রাজা-মহারাজারা তাঁদের সভাসদ নিয়ে উচ্চাঙ্গসংগীত উপভোগ করতেন। উচ্চাঙ্গকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে আসার কৃতিত্ব উল্লাসকেও দেওয়া হয়। তবে এর জন্য উল্লাস গতিপথ বদলাননি। বরং উচ্চাঙ্গের মুকুটে নতুন পালক গুঁজেছেন। তিনি জোড় রাগ গাওয়ায় সিদ্ধহস্ত। দুই রাগের যেগুলো সমস্বর সেগুলোকে সেতু বানিয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে এপার-ওপার চলাচল করেন। শ্রোতারা অবাক বনে যায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্লান দাসগুপ্ত বলেন, ‘উল্লাসের সৃজনশীলতা তাঁর পরিবেশনাকে সুমধুর করে। উল্লাস সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখেন। তিনি রাগের নব নব রূপ কল্পনা করেন এবং সেগুলোকে শ্রোতার কাছে পৌঁছেও দিতে পারেন।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসা অর্জন করেছেন তিনি। উচ্চাঙ্গসংগীতে অবদানের জন্য উল্লাস কশলকর পদ্মশ্রী, যদুভট্ট পুরস্কার, স্বররত্ন পুরস্কার ও সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। জগত্গুরু শংকরাচার্য তাঁকে গানতপস্বী খেতাবে ভূষিত করেছেন। গুরু হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমির সঙ্গে সংশিষ্ট ছিলেন। বর্তমানে বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের প্রধান গুরু।

ওস্তাদ আশিষ খাঁ

সেনিয়া মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ও ভারতীয় রাগসংগীতের কিংবদন্তি আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুরে। তাঁর পুত্র বিশ্ববিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ। আলাউদ্দিন খাঁর দৌহিত্র ও আলী আকবর খাঁর পুত্র ওস্তাদ আশিষ খাঁ। ১৯৩৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম। তালিম নিয়েছেন বাবা ও পিসিমা অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে। ১৯৬৯ সালে প্রখ্যাত তবলাশিল্পী জাকির হোসেনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ‘শান্তি’ দল প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তাঁরা গড়ে তোলেন ফিউশন দল ‘দ্য থার্ড আই’। জন বারহাম, জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটনসহ বিশ্বের বহু নামিদামি শিল্পীর সঙ্গে বাজিয়েছেন তিনি। কাজ করেছেন ‘অপুর সংসার’, ‘জলসাঘর’, ‘পরশপাথর’, ‘গান্ধী’, ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রে। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ইলিনয় আর্টস কাউন্সিল ফেলোশিপ, সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন। ভারতের প্রথম শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী হিসেবে তিনি ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। শিল্পী ও সংগীত পরিচালক ওস্তাদ আশিষ খাঁ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব আর্টসে যন্ত্রসংগীতের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত। এর বাইরে কানাডা, ইউরোপ, আফ্রিকা, কলকাতাসহ বিশ্বের অনেক প্রান্তেই তাঁর শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসছেন তিনি।

পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা

‘সন্তুর’ শব্দটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার নাম। মঞ্চে উঠে শিবকুমার শর্মা যখন সন্তুরে হাত ভোলান শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনেন। ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। বয়স ৭৮ পেরিয়েছে, তবে হাতের ধার একটুও কমেনি। নানা বাধা উপেক্ষা করে বাবার অনুপ্রেরণায় কাশ্মীরি লোকসংগীতে ব্যবহৃত সন্তুরকে মার্গসংগীতের মঞ্চে তুলে আনেন। একনিষ্ঠ অধ্যবসায়, ক্লান্তিহীন গবেষণা ও পুনঃপুনঃ বিনির্মাণের মাধ্যমে সন্তুরবাদনে তিনি নতুন মাত্রা সংযোজন করেন, যা তাঁকে এনে দেয় অভাবনীয় সাফল্য। জীবন্ত কিংবদন্তি পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। তিনি পদ্মবিভূষণ, পদ্মশ্রী, তানসেন সম্মান, মাস্টার দীননাথ মঙ্গেশকর পদক, আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি পদক, ইন্দিরা গান্ধী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লেটারস, সংগীত নাটক একাডেমি ফেলোশিপসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় শিবকুমার শর্মার প্রথম অ্যালবাম ‘শিবকুমার শর্মা : দ্য মায়েস্ট্রা চয়েজ, সিরিজ ১’। এখন পর্যন্ত তাঁর অ্যালবামের সংখ্যা ২৪।

 

View Full Article