Menu

রাতভর ধ্রুপদী সুর ও নৃত্যের লহরি

মামুন মিজানুর রহমান: দর্শক-শ্রোতার ভিড় বাড়ছে উচ্চাঙ্গসংগীত উত্সবে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত স্টেডিয়ামে ছিল বিপুল শ্রোতার উপস্থিতি। স্কয়ার নিবেদিত এ উত্সবে সহযোগিতা করছে ব্র্যাক ব্যাংক। এবারের উত্সব উত্সর্গ করা হয়েছে প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে।
রাগাশ্রয়ী সংগীত ও বাদনে মুগ্ধ হন হাজারো শ্রোতা। স্টেডিয়ামের বাইরে ও মূল প্রবেশপথে ছিল দীর্ঘ সারি। গতকাল ছিল পঞ্চম বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীত উত্সবের দ্বিতীয় দিন। সন্ধ্যায় রাগরাগিণীর যে লীলা শুরু হয়েছিল, প্রভাতের রাঙা আলো ফোটা পর্যন্ত চলে সেই রাগের রেশ।
উত্সবের প্রথম রাতের মতো দ্বিতীয় রাতের পরিবেশনাও শুরু হয় নৃত্যের মাধ্যমে। শুরুতেই ছিল ওড়িশি নৃত্যের ঝঙ্কার। এ পর্বে মঞ্চে তৈরি হয়েছিল কিছুটা পারিবারিক আবহ। ওড়িশি নৃত্যধারার খ্যাতিমান প্রবক্তা বিদুষী মাধবী মুডগালের পরিবেশনার মাধ্যমে শুরু হয় আয়োজন। ভারত সরকারের পদ্মশ্রী খেতাবপ্রাপ্ত শিল্পী তিনি। মঞ্চে সঙ্গী ছিলেন তার ভ্রাতুষ্পুত্রী ও শিষ্যা আরুশি মুডগাল। আরুশি ইতোমধ্যেই কৌশলগত উত্কর্ষ ও মূলধারার নৃত্যে নতুন মাত্রা সংযোজন করে ঘরে তুলেছেন বিভিন্ন সম্মাননা। মাধবী মুডগালের প্রথম পরিবেশনা ছিল ‘নটরাজ’। দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল আরুশি মুডগালের রাগ শাহানার আশ্রয়ে ‘আলহাদ’ শিরোনামের একক পরিবেশনা। এতে উঠে আসে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের অনুভূতি। এরপর মাধবী মুডগাল ‘অষ্টপদী’ শীর্ষক নৃত্যে কৃষ্ণ ও রাধার অমর প্রেমগাথার মানবিক দিক তুলে ধরেন। মধ্যযুগের কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে এ নাচটি গৃহীত। এ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের ‘হেমন্তে কোন্্ বসন্তেরই বাণী/ পূর্ণশশী ওই-যে দিন আনি’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন আরুশি মুডগাল। সবশেষে ছিল ‘ভৈরবী পল্লবী’ শিরোনামে দুজনের যৌথ নৃত্য পরিবেশনা। ওড়িশি নাচের এই পুরো পরিবেশনার সঙ্গে আবহ সংগীত পরিবেশন করছিলেন মধুপ মুডগাল ও সমরজিত্ রায়।
ওড়িশি নৃত্যের পর পরই মঞ্চে ঝঙ্কার ওঠে তবলার বোলে। বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের এ পরিবেশনা যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। এ পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন চিন্ময় ভৌমিক, ফাহমিদা নাজনীন সুমাইয়া, এম জে জে ভুবন, নুসরাত-ই-জাহান খুশবু, পঞ্চম স্যানাল, প্রশান্ত ভৌমিক ও সুপান্থ মজুমদার।
তবলা বাদনের পর খেয়াল পরিবেশন করেন বাংলাদেশের শিল্পী প্রিয়াঙ্কা গোপ। নানা রাগের পরিবেশনায় শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের এই শিক্ষিকা।
তবলায় তার সঙ্গে সঙ্গত করেন বাংলাদেশের তবলচি ইফতেখার আলম প্রধান।
ভিড় বাড়ছিল ধীরে ধীরে। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে পুরো স্টেডিয়াম প্রায় ভরে যায় শ্রোতায়।
সন্তুর বাজাতে মঞ্চে আসেন রাহুল শর্মা। তিনি প্রবাদপ্রতিম সংগীতবেত্তা পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার পুত্র। সন্তুর বাজিয়ে তিনি পেয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা। তার সঙ্গে তবলায় ছিলেন সত্যজিত্ তালওয়ালকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ শোয়েব ও তার দল পরিবেশন করে দলীয় কণ্ঠসংগীত। এ পরিবেশনায় তবলায় ইফতেখার আলম প্রধান ও পাখওয়াজে সুষেন কুমার রায় সঙ্গত করেন। এরপর ছিল পূর্বায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের পরিবেশনায় সেতার বাদন। তার সঙ্গে তবলায় ছিলেন অনুব্রত চট্টোপাধ্যায়।
সেতারের সুর থামার পর কণ্ঠসংগীত নিয়ে মঞ্চে আসেন পণ্ডিত উলহাস কশলকার। গোয়ালিয়র, জয়পুর ও আগ্রা ঘরানার ধারক ও বাহক তিনি। তার সঙ্গে তবলায় ছিলেন পণ্ডিত সুরেশ তালওয়ারকার।
উচ্চাঙ্গসংগীত উত্সবে এবারই প্রথম যুক্ত হয়েছে ম্যান্ডোলিন। গ্রামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়নপ্রাপ্ত ইউ রাজেশ ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। তার সঙ্গে বাঁশি বাজান গ্রামি অ্যাওয়ার্ড মনোনয়নপ্রাপ্ত বংশীবাদক পণ্ডিত রনু মজুমদার। তবলায় ছিলেন পণ্ডিত অভিজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবলার বোল, বাঁশি আর ম্যান্ডোলিনের সুরে সুরে শুরু হয় নতুন ভোর।
আজ শনিবার তৃতীয় দিনের অধিবেশনের শুরুতেই থাকছে বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের দলীয় সরোদ বাদন। কর্ণাটকি বাঁশি পরিবেশন করবেন কর্ণাটকের বংশীবাদক শশাঙ্ক সুব্রহ্মণ্যন। পদ্মভূষণ ড. প্রভা আত্রে পরিবেশন করবেন খেয়াল। একক তবলা পরিবেশন করবেন পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। ধ্রুপদ পরিবেশন করবেন পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর। সেতার পরিবেশন করবেন পণ্ডিত সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। আজকের শেষ আকর্ষণ ওস্তাদ রশিদ খান।